ঢাকা, সোমবার   ১৪ জুন ২০২১ ||  জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৪২৮

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষাগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:৩২, ১০ মে ২০২১  

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমরা ঔপনিবেশিক যুগের প্রয়োজন থেকেই ইংরেজি শিখেছি। ভারতীয় মহাদেশে ঔপনিবেশিক কাল থেকে ইংরেজি ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম, শিক্ষা, প্রশাসনিক কাজে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। সামাজিক মর্যাদা অর্জনে ইংরেজি শেখা গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পূর্ব পর্যন্ত ইংরেজি ভাষার এই দৌরাত্ম্য ও মর্যাদা অবস্থান করে। মানবজাতি বিদেশি ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এসেছে পরাধীনতা থেকে। বিদেশি ভাষায় দক্ষতা অর্জন একজন মানুষের পক্ষে সব সময়ই সম্মানের বিষয়। তুলনামূলকভাবে আমাদের সমাজে একটি ভাষা জানা লোকের মর্যাদা অপেক্ষাকৃত কম।
বৃটিশরা ভারতবর্ষ প্রায় ২০০ বছর শাসন করেছে। শাসকগোষ্ঠীর ভাষারূপে এই সময়কালে ইংরেজি ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে আমরা বাংলা ভাষার সুনিপূণ মর্যাদা লাভ করেছি উর্দু ও ইংরেজির পরিবর্তে। বর্তমানে বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষাকে একটি বিদেশি ভাষা হিসেবে দেখা হয়। যদিও বাংলাদেশ সরকার ইংরেজি ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা দেয়নি। তারপরও বাংলাদেশে ইংরেজি শেখার গুরুত্বকে অবহেলা করার কোনো উপায় নেই। অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক বিশ্বায়নের এই যুগে ইংরেজি ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইউনেস্কোর মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। কিন্তু এখনো আমরা আর্ন্তজাতিকভাবে বাংলায় যোগাযোগ করতে পারছি না।

ইংরেজি ভাষার দক্ষতা আমাদের কাজের নিশ্চয়তা এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেয়। ফলে যুব সমাজ ইংরেজি ভাষা শেখায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। বাংলা থেকে ইংরেজিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা বাংলা ও ইংরেজি মিশিয়ে এক অদ্ভুত ভাষায় কথা বলে। এই অদ্ভুত কৃত্রিম ভাষা আমাদের বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ধ্বংস করে দিচ্ছে।

অনেককেই দেখা যায়, নিজের মাতৃভাষা সম্পর্কে অবজ্ঞামূলক ধারণা পোষণ করতে। এমন যে পরাক্রমশালী বৃটিশ জাতি তারাও তাদের সব বিজ্ঞান ও অন্যান্য বহু পরিভাষায় মূল গ্রিক-লাতিন ঠিক রেখেই জ্ঞানচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে আজকের জায়গায় পৌঁছেছে। আবার গ্রিক ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারাও যে জাতিকে আক্রমণ করে নিজেরা সমৃদ্ধ হয়েছে; সে জাতির দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। গ্রীসের রাজধানী এথেন্সের আদি নামকরণ যা ক্লসের দেবী এথেনা থেকে হয়েছে, তাকে পাল্টে ফেলতে পারেনি গ্রিকরা। একসময় ক্লসকে পরাজিত করে গ্রিকরা।

ভারতবর্ষের ভাষা ও সংস্কৃতি পৃথিবীর যেকোনো জাতির ইতিহাস থেকে ঈর্ষণীয় নিঃসন্দেহে। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ইংরেজি ভাষার ওপর নির্ভরতা অন্যান্য ভাষাগুলোর গতিপথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল। সেই সময়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষাগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ইংরেজি শিক্ষার কুফল সম্পর্কে তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন।

যদিও ভারতবর্ষের শিক্ষিত সমাজ ইংরেজ শাসনকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছিল। শাসন প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে বাংলা গদ্য সাহিত্যের সূত্রপাত হয়েছিল সে সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথ জ্ঞাত ছিলেন। বাংলা শব্দতত্ত্ব গ্রন্থের ভাষার কথা (১৩২৩) প্রবন্ধে তিনি এ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলা গদ্য সাহিত্যের সূত্রপাত হইল বিদেশির ফরমাশে এবং তার সূত্রধর হইলেন সংস্কৃত পন্ডিত, বাংলা ভাষার সঙ্গে যাদের ভাসুর ভাদ্র বউয়ের সম্বন্ধ।’ রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি শিক্ষার কুফল সম্পর্কে তাঁর জোরালো বক্তব্য প্রদান করেন। ভাষার কথা প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি ভাষার প্রচণ্ড প্রতাপের মধ্যে বাংলা ভাষাচর্চা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার বর্ণনা দিচ্ছেন, ‘অপেক্ষাকৃত আধুনিককালেও আমাদের দেশে ভাষা ও চিন্তার মধ্যে এইরূপ দ্বন্দ্ব চলিয়া আসিতেছে। যারা ইংরেজিতে শিক্ষা পাইয়াছেন তাঁদের পক্ষে ইংরেজিতেই চিন্তা করা সহজ; বিশেষত যে সকল ভাব ও বিষয় ইংরেজি হইতেই তাঁরা প্রথম লাভ করিয়াছেন সেগুলো বাংলা ভাষায় ব্যবহার করা দুঃসাধ্য। কাজেই আমাদের ইংরেজি শিক্ষা ও বাংলা ভাষা সদরে অন্দরে স্বতন্ত্র হইয়া বাস করিয়া আসিতেছে।’

রবীন্দ্রনাথ এখানে মানব জাতির ভাষা ও সংস্কৃতির যোগাযোগের কথা বলেছেন। তৎকালীন বাংলা ভাষাচর্চার চলমান ধারা ও সংযোগ আবিষ্কার করেছেন। বাংলা গদ্যের চলমান প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ইংরেজি ভাষার প্রভাবে বাংলা ভাষার প্রকৃতি যে উপেক্ষিত হয়েছে এবং তার ফলে বাংলা ভাষাচর্চায় সংকট তৈরি হয়েছে, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত এবং তার সপক্ষে যথেষ্ট ঐতিহাসিক সাক্ষ্য প্রমাণ ও সমর্থন পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন লেখায়। রবীন্দ্রনাথ সেই সংকটকে চিহ্নিত করেছেন এবং সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করেছেন। তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ তাঁর ভাষা বিষয়ক সব লেখনি। যেমন- বাংলা ব্যাকরণ (১৩০৮) প্রবন্ধে বানান সংক্রান্ত একটা অংশ নিচে উদ্ধৃত হলো, ‘আমরা জড় এর জ এবং যখন এ ও য একই রকম উচ্চারণ করি, আলাদারকম লিখি। উপায় নাই। শিশু বাঙলা গদ্যের ধাত্রী ছিলেন যাহারা, তাহারা এই কান্ড করিয়া রাখিয়াছেন। সাবেক কালে যখন শব্দটাকে বর্গ্য জ দিয়ে লেখা চলিত- ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পন্ডিতরা সংস্কৃতের যৎ শব্দের অনুরোধে বর্গ্য জ কে অন্তস্থ য করিয়া লইলেন, অথচ ক্ষণ শব্দের মূর্ধন্য ণ-কে বাংলায় দন্ত্য-ন ই রাখলেন।’ (রবীন্দ্রনাথ : ১৪০২)

বৃটিশের শাসনকালে বাংলা গদ্য নির্মাণের প্রথমদিকে রবীন্দ্রনাথের সিদ্ধান্তসমূহ অনুধাবনযোগ্য:
১. বাংলা বানান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলার যুক্তি ব্যবহৃত হয়নি; আর সংস্কৃতের যুক্তিতে যা করা হয়েছে- তাতেও সাম্য রক্ষিত হয়নি।

২. রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্য-বাংলা বানানের সরলতা, ব্যবহার যোগ্যতা আর সাম্য আনার লক্ষ্যে বাংলার নিজস্ব প্রকৃতির আশ্রয় নেওয়া প্রয়োজন। সেদিক থেকে পণ্ডিতেরা প্রাকৃত ভাষার সাহায্য গ্রহণ করেননি।

৩. বাংলাভাষা চর্চার মতো বাংলা গদ্যচর্চার ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কার করেছেন ইংরেজি শিক্ষার অব্যাহত কুফল। তাঁর মতে এই সংকট থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এমনকি বঙ্কিমচন্দ্রও রেহাই পাননি।

‘বাংলা কথ্যভাষা’ (১৩৫০) প্রবন্ধে বাংলা গদ্যচর্চার গোড়ার দিকের সংকট নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। ‘যখন বাংলাভাষায় গদ্যসাহিত্যের অবতারণা হল তার ভার নিলেন সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত। দেশের ছেলেমেয়েদের মুখে মুখে প্রতিদিন যে গদ্যবাণী প্রবাহিত হচ্ছে তাকে বহুদূরে রেখে সংস্কৃত সরোবর থেকে তাঁরা নালা কেটে যে ভাষার ধারা আনলেন তাকেই নাম দিলেন সাধুভাষা। বাংলা গদ্য সাহিত্যিক ভাষাটা বাঙালির প্রাণের ভেতর থেকে স্বভাবের নিয়মে গড়ে ওঠেনি- এটা ফরমাশে গড়া। ...বঙ্কিমের সেই দুর্গেশনন্দিনীর ভাষাও আজ প্রায় মরা গাঙের ভাষা হয়ে এসেছে- এখনকার সাহিত্যে ঠিক সেই ভাষার স্রোত চলছে না।’

বাংলা ভাষা ও গদ্যসাহিত্যের ইতিহাসের গোড়ার সময়টা সঠিক স্রোতে বয়ে চলেনি। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা প্রশ্নে একরকম বিপ্লবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ভাষার সঠিক দিক নির্দেশনা ও গতিপথ নির্ধারণে তিনি নেতৃত্ব দান করেছেন। বাংলা গদ্যসাহিত্যের ইতিহাসে এই প্রেক্ষাপটে তিনি অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তীব্র বাক্যবাণে তিনি জর্জরিত করেছেন পণ্ডিত সমাজকে। সাহেব-পণ্ডিতের যোগসাজশে তৈরি বাংলা গদ্য যে আড়ষ্ট অভিভুত হয়ে পড়েছে তা তিনি উপলব্ধি করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। এ অবস্থার উত্তরণ ঘটানো যে আশু প্রয়োজন এবং তার কুফল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী ও সবাইকে সচেতন করার প্রয়াস চালিয়েছেন তাঁর লেখায়। শতাব্দীর বিজ্ঞ ভাষা সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ ‘শিক্ষার বিকিরণ’ প্রবন্ধে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাদানের কুফল সম্পর্কে বলেছেন, ‘যে পরিমাণে শিক্ষা পাই সে পরিমাণে বিদ্যা পাই নে- চারদিকের আবহাওয়া থেকে এ বিদ্যা বিচ্ছিন্ন।’ রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন মাতৃভাষাকে অবলম্বন করে শিক্ষাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে।

বাংলা ভাষার এ অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রশ্নে তিনি ছিলেন অনড়। ইংরেজির বদলে বাংলা ভাষার ব্যবহার আর বিশুদ্ধ বাংলা ব্যবহারের নানা উদ্যোগ সংগঠিত কার্যক্রম চলছিল সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। যার প্রতিষ্ঠা গুরু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলায় বক্তৃতা প্রদানের মানসিকতা ও ভালোবাসা তৈরির ব্যাপারেও তিনি প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। যে কারণে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিষয়টিকে উদ্বুদ্ধ করেন। মাতৃভাষা ও নিজ সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, মমত্ববোধ, সর্বোপরি আন্তর্জাতিকতাবোধ, বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার যে মানসিকতা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিরাজ করত তার প্রমাণ তাঁর রচিত সাহিত্যকর্ম ও জীবনপ্রণালীর ভেতর থেকে আমরা পাই। একটি গোটা জাতি ও তার সংস্কৃতিকে জীবনের ভেতর ধারণ করার শিক্ষা রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয় (১৮৯৩) এতে ভাষাচর্চার ধারায় বাংলাসহ ভারতীয় ভাষাগুলোর অধ্যয়নে তাৎপর্যপূর্ণ নতুনত্ব দেখা দেয়। ভাষাচর্চা একটি সাংগঠনিক ভিত্তি লাভ করে। বাংলা সাহিত্যের উন্নতি ও প্রসারের উদ্দেশে স্থাপিত প্রতিষ্ঠান বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মূল উদ্যোক্তা পুরুষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়