ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ মার্চ ২০২১ ||  ফাল্গুন ১৭ ১৪২৭

পিরামিডের সেই ধারণা বহু বছর পর ভিন্ন আঙিকে

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫:৫০, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

বিশ্বের বিস্ময় পিরামিড। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের বিস্ময় পিরামিড। ছবি: সংগৃহীত

মিশরীয় পিরামিড জগৎবিখ্যাত হলেও সর্বপ্রথম প্রাচীন সভ্যতাকেন্দ্র মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরা পিরামিড আকৃতির স্থাপনা তৈরি করেছিলেন, যাদের নাম ছিল 'জিগুরাত' আর এদের উজ্জল সোনালি/তামাটে রঙে বর্ণিল করা হতো।

পিরামিডের সেই ধারণা বহু বছর পর ভিন্ন আঙিকে রূপ লাভ করে নীল নদের দেশ মিশরে। মিশরীয়রা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতো, মৃত্যুর পরও তাদের আত্মা বেঁচে থাকে। কাজেই পরবর্তী জীবনে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, জীবনটাকে যাতে উপভোগ করা যায়, সে চিন্তায় মিশরীয়রা অস্থির থাকতো। ব্যক্তির গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে গুরুত্ব আরোপ করা হতো এ ব্যাপারে। ব্যক্তি যতো গুরুত্বপূর্ণ হতো এ কাজে গুরুত্ব ততো বেশি বেড়ে যেতো।

মিশরীয়রা মনে করত, লাশ বা মৃতদেহ টিকে থাকার ওপরই নির্ভর করে আত্মার বেঁচে থাকা বা ফিরে আসা। এ কারণেই মৃতদেহ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে মমি করতো তারা। তদুপরি আত্মার বেঁচে থাকার জন্য চাই প্রয়োজনীয় নানা জিনিস। তাই নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র, বিশেষ করে খাবার-দাবার মৃতদেহের সাথে দিয়ে দিতো তারা। সমাধিস্তম্ভ প্রধানের দায়িত্ব ছিলো দস্যুদের হাত থেকে মৃতদেহ আর তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র রক্ষা করার। কিন্তু কবরে সমাধিত ব্যক্তিটি কত বিপুল পরিমাণ বিত্ত আর ক্ষমতাবান ছিল তা জাহিরের উদ্দেশ্যেও নির্মাণ করা হতো পিরামিড। তাই ফারাওদের মৃতদেহের সাথে কবরস্থ করা হতো বিপুল ধন-সম্পদ। সমাজের বিত্তশালীদের কবরেও মূল্যবানসামগ্রী দেয়া হতো। এমনকি, নিন্মশ্রেণীর মানুষদের কবরেও সামান্য পরিমাণ হলেও কিছু খাবার রেখে দেয়া হতো।

প্রাচীন মিশরীয় শাসক বা রাজাদের ফিরাউন বা ফারাও বলা হতো। তাদেরকে কবর বা সমাধি দেয়ার জন্যই পিরামিড নির্মান করা হয়। মিসরে ছোটবড় ৭৫টি পিরামিড আছে। সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষনীয় হচ্ছে গিজা'র পিরামিড যা খুফু'র পিরামিড হিসেবেও পরিচিত। এটি তৈরি হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০০ বছর আগে। এর উচ্চতা প্রায় ৪৮১ ফুট। এটি ৭৫৫ বর্গফুট জমির উপর স্থাপিত। এটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল প্রায় ২০ বছর এবং শ্রমিক খেটেছিল আনুমানিক ১ লাখ। পিরামিডটি তৈরি করা হয়েছিল বিশাল বিশাল পাথর খণ্ড দিয়ে। পাথর খন্ডের এক একটির ওজন ছিল প্রায় ৬০ টন, আর দৈর্ঘ্য ছিল ৩০ থেকে ৪০ ফুটের মত। এগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল দূর দুরান্তের পাহাড় থেকে। পাথরের সাথে পাথর জোড়া দিয়ে পিরামিড তৈরি করা হত।

চার হাজারের বছরের পুরানো এক সমাধিতে অঙ্কিত এক চিত্রে দেখা যায় এক বিশাল স্তম্ভকে স্লেজে করে সরানো হচ্ছে; অনেক মানুষ রশি দিয়ে সেই স্লেজ টেনে নিচ্ছে। আর তাদের মধ্যে একজন পাত্র থেকে জল ঢালছে বালির উপরে। এতে ঘর্ষণ প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। এভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আড়াই টন ওজনের এক একটা ব্লক।

পিরামিড আসলে সমাধিক্ষেত্র বা 'মৃতের আত্মার ঘর' নামে পরিচিত। বর্গাকার, ডিম্বাকার অথবা আয়তাকার ভিত্তির উপর ক্রমহ্রাসমান স্তরে স্তরে তৈরি হতো পিরামিডের স্থাপনা।  এটি হলো এক প্রকার জ্যামিতিক আকৃতি বা গঠন যার বাইরের তলগুলো ত্রিভূজাকার এবং যারা শীর্ষে একটি বিন্দুতে মিলিত হয়। পিরামিড একটি বহুভূজাকৃতি ভূমির উপর অবস্থিত। পিরামিডের ভূমি যেকোনো আকারের বহুভূজ হতে পারে এবং এর পার্শ্বতলগুলো যেকোনো আকারের ত্রিভূজ হতে পারে। একটি পিরামিডের কমপক্ষে তিনটি ত্রিভূজাকার পার্শ্বতল থাকে, অর্থাৎ পিরামিডের ভূমিসহ কমপক্ষে চারটি তল থাকে। বর্গাকার পিরামিড হলো এমন একটি পিরামিড যা একটি বর্গাকার ভূমির উপর অবস্থিত এবং যার চারটি ত্রিভুজাকার পার্শ্বতল আছে। এই ধরনের পিরামিডের বহুল ব্যবহার আছে। পিরামিডের ডিজাইন এমনভাবে করা হয় যেন এর বেশি ওজন ভূমির নিকটে থাকে, ফলে এর আয়তনকেন্দ্র শীর্ষ হতে লম্ব দূরত্বের এক-চতুর্থাংশে অবস্থিত।

এক আশ্চর্যজনক কলা-কৌশলে হাজার হাজার বছর আগের প্রাচীন পৃথিবীতে নির্মিত হয়েছিল বিশ্বের বিস্ময় পিরামিড। সূচনায় সমাধিস্থল হলেও এখন তা পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত পৃথিবীর অন্যতম প্রধান স্ট্যুরিস্ট স্পট। আফ্রিকার প্রধান জলধারা নীল নদ ছুঁয়ে বালুকাময় প্রান্তরে মাথা উঁচিয়ে পিরামিড জানান দিচ্ছে মানব সভ্যতার অবিস্মরণীয় নিদর্শনের।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়